বাংলায় দুর্গাপুজোর ইতিহাস

জমিদারবাড়ির উঠোন থেকে বারোয়ারি, বারোয়ারি থেকে সর্বজনীন — আর সেখান থেকে ইউনেস্কো।

দুর্গাপুজো বাংলায় সবসময় এই চেহারার ছিল না। আজ যেটা শহরজোড়া, রাস্তা-বন্ধ-করা, থিম-নির্ভর উৎসব, চারশো বছর আগে সেটা ছিল কয়েকটা বড় বাড়ির ভিতরের ব্যাপার। মাঝের পথটাই আসল গল্প — কী করে পুজো উঠোন থেকে রাস্তায় নামল।

কলকাতার আগে

শরৎকালের দুর্গাপুজোর প্রথম বড় আয়োজন কে করেছিলেন, তা নিয়ে একাধিক দাবি আছে, আর কোনোটাই নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়। সবচেয়ে বেশি শোনা যায় দুটো নাম: রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ, আর নদিয়ার ভবানন্দ মজুমদার। দুজনেই ষোড়শ শতকের শেষ দিকের।

এই পুজোগুলো ছিল জমিদারি ক্ষমতার প্রদর্শন। খরচ হত বিপুল, নিমন্ত্রণ যেত এলাকার গণ্যমান্যদের কাছে, আর সাধারণ মানুষ ঢুকত না — দেখত বাইরে থেকে। পুজো তখন ভক্তি আর প্রতিপত্তি, দুটোই।

বনেদি বাড়ির পুজো

কলকাতায় সবচেয়ে পুরনো যে পুজোটার কথা নিয়মিত বলা হয়, সেটা বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের, ১৬১০ সাল থেকে। শহর তখনো শহর হয়নি — গোবিন্দপুর, সুতানুটি আর কলিকাতা তিনটে আলাদা গ্রাম।

আঠারো শতকে কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করে যে নতুন ধনী শ্রেণি তৈরি হল, তারা পুজোকে নিজেদের অবস্থান জানানোর উপায় করে তুলল। শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো এর সবচেয়ে চেনা উদাহরণ — রাজা নবকৃষ্ণ দেব ১৭৫৭ সালে শুরু করেন, পলাশির বছরেই, আর সেখানে ইংরেজ কর্তারা নিমন্ত্রিত হয়ে আসতেন।

এই বাড়ির পুজোগুলোর অনেকগুলো আজও চলছে, আর বেশিরভাগই পুজোর ক’দিন বাইরের লোককে ঢুকতে দেয়। প্রতিমা সাধারণত একচালা — দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ সবাই এক কাঠামোয়, যেটা সর্বজনীন পুজোর আলাদা আলাদা মূর্তির চেয়ে পুরনো রীতি।

বারোয়ারি: বারো বন্ধুর পুজো

মোড় ঘোরে ১৭৯০ সালে, হুগলির গুপ্তিপাড়ায়। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী বারোজন বন্ধু স্থানীয় একটা বাড়ির পুজোয় ঢুকতে না পেরে নিজেরাই চাঁদা তুলে পুজো করেন। বারো + ইয়ার, অর্থাৎ বারো বন্ধু — সেখান থেকেই “বারোয়ারি”।

ছোট শোনালেও এটাই আসল বদল। পুজোর খরচ যখন একটা পরিবারের বদলে একটা পাড়ার, তখন পুজোটাও আর ওই পরিবারের থাকে না। মালিকানা বদলে গেল।

সর্বজনীন

“সর্বজনীন” কথাটার মানে সবার জন্য, আর সেটাই ঘোষণা। কলকাতায় সাধারণত ১৯১০ সালের বাগবাজারের সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভার পুজোকে প্রথম সর্বজনীন বলা হয়। ১৯২৬ সালে তৈরি হয় বাগবাজার সর্বজনীন, যেটা আজও শহরের সবচেয়ে পরিচিত পুজোগুলোর একটা।

বিশ শতকের প্রথমার্ধে পুজো আর রাজনীতি জড়িয়ে যায়। স্বদেশি আন্দোলনের সময় পাড়ার পুজোর মণ্ডপ ছিল এমন একটা জায়গা যেখানে বড় জমায়েত সন্দেহ না জাগিয়ে হতে পারত।

রেডিও, মহালয়া আর ভোর চারটে

বাঙালির পুজো শুরু হয় মহালয়ার ভোরে, রেডিওতে মহিষাসুরমর্দিনী দিয়ে। অনুষ্ঠানটি প্রথম সম্প্রচারিত হয় ১৯৩১ সালে, আকাশবাণী কলকাতা থেকে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ, পঙ্কজকুমার মল্লিকের সুর।

১৯৭৬ সালে একবার বীরেন্দ্রকৃষ্ণের বদলে অন্য একটি সংস্করণ সম্প্রচার করা হয়েছিল। শ্রোতারা এতটাই ক্ষুব্ধ হন যে পরের বছর পুরনোটাই ফিরিয়ে আনা হয়, আর তারপর থেকে আর বদলানো হয়নি।

মহালয়া কিন্তু পুজোর শুরু নয় — দেবীপক্ষের শুরু। ওই দিন ভোরে গঙ্গার ঘাটে তর্পণ হয়, আর কুমোরটুলিতে প্রতিমার চোখ আঁকা হয়, যাকে বলে চক্ষুদান। পুজো শুরু ষষ্ঠীতে, বোধনে।

থিমের যুগ

নব্বইয়ের দশক থেকে পুজো আরেকবার বদলায়। মণ্ডপ আর শুধু প্রতিমা রাখার জায়গা থাকে না — গোটা মণ্ডপটাই একটা শিল্পকর্ম হয়ে ওঠে। ক্লাবগুলো নামী শিল্পী নিয়োগ করতে শুরু করে, বাজেট কোটি ছাড়ায়, আর পুরস্কারের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।

এর ফল মিশ্র। একদিকে বাঁশ, মাটি, কাগজ, পাট নিয়ে অসাধারণ কাজ হচ্ছে, যেটা বছরের আর কোথাও হয় না। অন্যদিকে খরচের চাপ, বিজ্ঞাপনদাতাদের উপর নির্ভরতা, আর পাড়ার পুজোর সেই ঘরোয়া ভাবটা অনেক জায়গায় হারিয়ে গেছে।

ইউনেস্কোর স্বীকৃতি

২০২১ সালের ডিসেম্বরে ইউনেস্কো “Durga Puja in Kolkata”-কে মানবজাতির অস্পৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় যুক্ত করে। ভারতের কোনো উৎসবের ক্ষেত্রে এটাই প্রথম।

ইউনেস্কোর বিবরণে যে কারণগুলো উল্লেখ করা হয়, তার মধ্যে আছে শিল্পী, কারিগর আর পাড়ার সম্মিলিত অংশগ্রহণ, আর শ্রেণি-ধর্ম নির্বিশেষে মণ্ডপ সবার জন্য খোলা থাকা। অর্থাৎ যে জিনিসটার জন্য স্বীকৃতি, সেটা জাঁকজমক নয় — সেটা গুপ্তিপাড়ার ওই বারোজনের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা।

ইতিহাসটা কোথায় গিয়ে দেখবেন

  • কুমোরটুলি — উত্তর কলকাতার কুমোরপাড়া, যেখানে প্রতিমা তৈরি হয়। মহালয়ার আগের সপ্তাহটাই দেখার সেরা সময়।
  • বনেদি বাড়ির পুজো — শোভাবাজার রাজবাড়ি, সাবর্ণ রায়চৌধুরী বাড়ি। একচালা প্রতিমা আর পুরনো রীতি এখানেই টিকে আছে।
  • বাগবাজার সর্বজনীন — শহরের প্রাচীনতম সর্বজনীন পুজোগুলোর একটা, আর আজও প্রথাগত ধাঁচে হয়।
  • বড় থিমের পুজো — দক্ষিণ কলকাতা আর সল্টলেকে। আজকের পুজো কোথায় দাঁড়িয়ে, সেটা এখানেই বোঝা যায়।

মণ্ডপ দেখুন